কোপাই তুমি আছো নেই শুধু……..

এই শীতকালে বনভোজনের আনন্দ নিতে সেদিন গেলাম কোপাই নদীর ধারে।অনেকগুলি পরিবার বন্ধু বান্ধবীরা মিলে কনকনে ঠান্ডায় উপভোগ করছিলাম বেশ।হাসি , মজা ,গল্প আর ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ হাতে শুধু আড্ডা আর আড্ডা। ‘কোপাই’ ছিল সবসময় আমাদের পাশটিতে, ঠিক যেন আমাদের আড্ডায় যোগদান করেছে সেও।মাঝে মাঝে ভেসে আসছে রান্নার সুগন্ধ……সবাই কেমন আনন্দে মেতে উঠেছে …চড়ুইভাতির আনন্দ….।হঠাৎ চোখ গেল পাশে পড়ে থাকা কোপাইএর ওই সুদূর প্রান্তে।কেমন সব ছবি যেন ভেসে উঠল চোখের সামনে….ঐতো সেই আমরা ছোট ছোট ভাইবোন কেমন নদীর চরে খেলে বেড়াচ্ছি….মা ডাকছেন তোরা এবার উঠে আয় সারা অঙ্গ বালিতে ভরে গেছে খুব দুস্টুমি করিস তোরা এখানে এসে……মনে পড়ছে সব একটু একটু করে……প্রত্যেক বছর আমার দাদু আর আমার ঠাম্মা পরিবারের সকলকে নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির দিন নদীর ধারে যেতেন বনভোজনে।ছোটবেলায় আমাদের ভাইবোন আর কাকা পিসীদের সে কি আনন্দ আর উৎসাহ।বাড়ির বড়ছেলে হওয়ার দরুন আমার বাবার উপর পড়ত সব কিছু জোগাড় করার ভার।সকাল সকাল চারটে গরুর গাড়িতে চেপে সকলের যাত্রা শুরু হতো।আগেরদিন ঠাকুমা আর মা কাকীমা বাসনপত্র ,শতরঞ্জি,রান্নার উপকরণ সব জোগাড় করে রাখতেন।সে এক উৎসবের আমেজ।আমাদের একান্নবর্তী পরিবার সেদিন এক অনাবিল আনন্দে ভেসে যেত সারাদিন।সবাই সেদিন মজা করে নদীতে স্নান করে তবেই খেতে বসত।নদীর স্নিগ্ধ শীতল টলটলে জলের নীচে ভেসে বেড়ানো ছোট ছোট খোলসে মাছ,চ্যাং মাছ আর পুঁয়ে মাছ ধরার আনন্দ তো ভোলার নয়।তারপর ঘরে ফেরার সময় নদীর ধারে ক্ষেত থেকে ছোলা গাছ তুলে ছোলা খেতে খেতে বাড়ি ফেরার দৃশ্য……..কেমন যেন মন খারাপ করতো নদীটাকে ছেড়ে চলে আসতে…..হঠাৎ সম্বিৎ ফিরল কেটারিংয়ের ছেলেটির ডাকে…ম্যাম আপনি কি আরও এক কাপ কফি নেবেন একদম ফ্রেশ বানিয়েছি….কিছুক্ষণ শূন্যতায় ভরে থাকি…..সেই তো নদীর ধারে বসে কফি পান করছি আমি ….আর কেটারিংয়ের দুরন্ত ছেলেগুলো দুপুরের খাবার রেডি করছে টেবিলে…..আমরা সবাই বনভোজনে…’কোপাই’ তুমি পাশে থেকো এমনি করে চিরদিন…..

Photo Credit: Tanushree Sinha

**** রেশমী সুতোর ডোর****

ছোটো বেলায় রাখী পূর্ণিমা দিনটির প্রায় একমাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত আমাদের রাখী বানানোর তোড়জোড়।নানা রঙের রেশমী সুতোর লেছি কিনে এনে রঙ মিলিয়ে মিলিয়ে চলত রাখী তৈরীর কাজ।প্রতিদিন স্কুলে যাবার আগে বই গোছানোর সাথে সাথে সঙ্গে একটা ছোট্ট প্যাকেটে করে নিয়ে নিতাম রেশমী সুতো, ছোটো কাঁচি, ছুঁচ সুতো আর পুরোনো হয়ে যাওয়া দাঁত মজা ব্রাশ।ক্লাসের ফাঁক পেলেই শুরু করে দিতাম নিপুণ ভাবে রাখী তৈরির কাজ।দিদিমণি ক্লাসে ঢুকলে গুটিয়ে রাখা থাকত সযত্নে।আবার টিফিন বেলায় তাড়াতাড়ি খাওয়ার কাজটা সেরে সে কি অস্থিরতা বন্ধুরা কে কেমন তৈরি করল তা দেখার জন্য বিভিন্ন ডিজাইনের আইডিয়া নেওয়ার জন্য।একমাসের মধ্যে পড়াশুনা নাচ গানের ফাঁকেই কখন যেন বানিয়ে ফেলতাম নানা রঙের চুমকি বসানো পুঁতি বসানো বিভিন্ন আকারের রাখী।সে ছিল আমাদের এক উৎসব।বড় দাদাদের হাতের বড় মাপের রাখী আর ছোট্ট ভাইটিদের জন্য এই এটুকুন ছোট্ট রাখী।এরপর একটু বড় বেলায় বানাতাম রঙ্গন ফুল আর সাদা টগর ফুলের কুঁড়ি দিয়ে ফুলের রাখী।খুব কদর ছিল সেই সমস্ত রাখীর।দাদা আর ভাইয়েরা সারাদিন পরে থাকত হাতে সেই রাখী গুলি।বার বার দেখতাম লুকিয়ে লুকিয়ে আর খুব গর্ব হতো মনে মনে।নিজের হাতে তৈরি যে।কত দিন রাত জেগেও রাখী তৈরি শেষ করেছি বেশ মনে আছে……আজও ফিরে ফিরে আসে সেই স্নেহের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার দিনটি।বাজারে বিকোয় কত রঙ বেরঙের ডিজাইনের রাখী….আমিও কিনি দলে পড়ে আলসেমী করে…….খুব মন কেমন করে মনে হয় এই রাখী গুলিতে আছে কি সেই ছোটো বোনের গায়ের গন্ধ আর নরম কোমল হাতের স্নেহ মাখা পরশ………কি জানি……

Photo Credit: Internet

নিঝুম নিস্তব্ধ সিঁনহ গড়

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়েছিলাম আমার ছেলের কাছে পুনে। অনেকদিন থেকেই পাহাড়ে মেঘ বৃষ্টি আর সবুজের সমারোহ দেখার ইচ্ছেটা বড় প্রবল হয়েছিলো।গুজরাটে দমনের বাসিন্দা আমার মেয়ে জামাইও এসেছিলো এই আনন্দ ভ্রমণে যোগ দিতে।পুনের কাছেই 35 কিলোমিটার দূরে রয়েছে সিঁনহ গড়।2000 বছর আগে তৈরি মারাঠা সাম্রাজ্যের অন্তর্গত এই দুর্গের ভগ্ন কিছু অংশ আজও ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।গড়ের প্রবেশ পথ “পুনে দারওয়াজা ” গড়ের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত।”কল্যাণ দারওয়াজা ” রয়েছে গড়ের দক্ষিন পশ্চিম দিকে।সুন্দর ভাবে তৈরি পাথরের সিঁড়ি পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় গড়ের বিভিন্ন দিকে।যতই উঁচুতে ওঠা যায় মেঘেরা এসে ছুঁয়ে যায় সারা শরীর।আলো আঁধারে ঘেরা “কল্যাণ দারওয়াজার” বৃষ্টির জলে ভেজা পাথরের সোপানে যখন পা রেখে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছি মেঘ আর ঘন সবুজে মোড়া খাদের দিকে ……সে যে কি রোমাঞ্চকর অনুভূতি বলে বোধহয় বোঝানো যাবে না।কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম ওই ভগ্নাবশেষের গা ঘেঁষে…..নিস্তব্ধ পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার জলের কুলু কুলু শব্দ আর নাম নাজানা পাখির ডাক গায়ে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছিলো……ভাবতে চেষ্টা করছিলাম বীর শক্তিশালী মারাঠাদের কথা……শিবাজী রাজের কথা……ছেলের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি ধরে অতি সন্তর্পনে উঠে পড়লাম একেবারে গড়ের চুড়োয়।এখান থেকে দেখতে পাওয়া যায় গোটা পুনে শহরটাকে যা মারাঠা সেনাদের দৃষ্টি গোচরে থাকত।কি অপূর্ব সে দৃশ্য……পাহাড়ের গা বেয়ে নেমেছে অগুনতি সরু সুতোর মতো সাদা ফেনিল ঝর্ণার ধারা আর ঘনসবুজ গাছের ঢল যেন নরম কার্পেট বিছানো…….পাহাড়ের মধ্যে কিছুটা সমতল ভূমিতে রয়েছে সেই 2000 বছর আগের পুরোনো একটি বিশালাকায় কুঁয়ো ।পাহাড়ের আন্তঃস্থলের ঝর্ণার জল এই কুঁয়োর জলের উৎস।শোনা যায় এই জল পান করে দেহের সমস্ত ক্লান্তি জুড়াতো সকলের। বড় বড় পাথর বিছানো পথে হাঁটতে গিয়ে বার বার পায়ে এসে ছুঁয়ে যায় ছোট ছোট ঝর্ণার জল। প্রকৃতি মায়ের কাছে সবাই আমরা কখন যে ছেলে মানুষ হয়ে যাই তা মালুম পড়ে অনেক পরে। এই আনন্দের কাছে বয়স হার মানে।গড় পাহাড়ের ওপরে স্থানীয় কিছু মারাঠি কয়েকটি খাবারের দোকানে মহিলাদের তৈরি অপূর্ব স্বাদের বেগুন ভর্তা আর বাজরার তৈরি অতি সুস্বাদু ভাকরী(রুটি) খেয়ে আমরা যখন নীচে নেমে এলাম তখন বিকেল গড়িয়েছে………

Photo credit: Tanushree Sinha

Design a site like this with WordPress.com
Get started